|| জীবনানন্দ পরবর্তীকাল এবং আধুনিক কবিতার আন্দোলন ||
পঞ্চাশ দশকের কবি
( দ্বিতীয় অংশ )
সৌম্য ঘোষ
পঞ্চাশ দশকে যে সমস্ত প্রতিভাবান কবিদের আমরা কলকাতা ভিত্তিক পশ্চিমবাংলার বাংলা কবিতার আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভাবে পেলাম, তাঁরা হলেন :
রাজলক্ষ্মী দেবী
_________________
জন্ম অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহে।কবিতায় প্রকৃতির মাধুর্য আর প্রেম । তাঁর কবিতার রচনা কত সৌন্দর্য আকর্ষণীয় । "পলাশ আবির আনে । সিঁদুরের সেজেছে কৃষ্ণচূড়া ।" প্রেমের নানান রূপান্তরের কথা তাঁর কবিতায় আমরা পাই : "তুমি একমাত্র তোমার তুলনা, / শুদ্ধ শরীরের মন্ত্রে করেছো প্রেমের অভিষেক। " তাঁর কবিতায় নারীর বেদনা অনুভূত হয় : " অর্ধেক নারী আমি, অর্ধেক যন্ত্রনা ।" আত্মিক উচ্চারণ তাঁর কবিতার বিরল মুহূর্ত ।
কবিতা সিংহ (১৯৩১--৯৯) :
-------------------------------------
নারীর পক্ষ নিয়ে কবিতা সিংহ বাংলা কবিতায় প্রথম বিদ্রোহিণী । তাঁর এক একটি কবিতায় উনিশ শতকী আবহ :
" বুকের এ তালপুকুরে
ভেবেছো ঘটি ডোবে না
এ অতল ফল্গু জলে
ও বাপু ছিপ্ ফেলো না.....।"
তাঁর কবিতায় নারী ‘অনলবর্ষিনী’ । মানুষ তাঁর কাছে মানুষ । নারী-পুরুষের তিনি লিঙ্গ ভিত্তিক ভেদ করতে রাজি নন।
তাঁর অমোঘ উচ্চারণ :
“সোনার শিকল/ আমি প্রথম/ভেঙেছিলাম/হইনি তোমার/ হাতের সুতোয়/ নাচের পুতুল/ যেমন ছিল/ আদম আদম/ আমি প্রথম / বিদ্রোহিণী/ তোমার ধারায়/ আমি প্রথম।”
কবি আলোক সরকার
( ১৯৩১--২০১৬)
_______________________
দুর্লভ প্রকৃতির মগ্ন কবি । স্বল্পভাষী প্রকৃতি মগ্ন এই ছবি সমকালের সব থেকে স্বতন্ত্র। তিনি বলেন, প্লাবিত সুন্দরতা, বিস্ময়, আনন্দের তরঙ্গায়িত উজ্জলতা আমাকে নিরন্তর টানে।
"পড়ন্ত বেলার রোদে
একাকি শালিক এক
দৃষ্টির বিস্ময় নিয়ে দিগন্তের সোনারঙ দেখে।"
সদয় প্রকৃতির সঙ্গে তন্ময় কবির ঘটেছে মৈত্রী :
“নীল আকাশ তার অচ্ছেদ্য স্নেহে
অন্তরালের প্রতিষ্ঠা প্রান্তরের গোপন বিশালতায়
সকালবেলায় বর্ণহীন ভালোবাসার আনন্দিত সুখ
রেখে দেবে ।”
প্রসঙ্গত: একটি তথ্য জানানোর লোভ সংবরণ করতে পারছিনা । কবি আলোক সরকার তখন বর্ধমান জেলার শ্যামসুন্দর কলেজের বাংলার অধ্যাপক । আমার দিদি (শ্রীমতি শাশ্বতী সরকার) ওনার ছাত্রী ছিলেন । সেই সুবাদে ‘স্যারের’ কাছে
আমার যাতায়াত ছিল । পরবর্তীকালে আমি যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের ছাত্র তখন তাঁর রাসবিহারীর বাড়িতে যেতাম ।
শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়
------------------------------------
(১৯৩১–) বাংলা কবিতা সাহিত্যের আর এক উজ্জল স্বতন্ত্র কবি। কার বেশিরভাগ কবিতায় একটা লঘু চাল আশ্রয় করেন তিনি।
” ফুঁ দিয়ে দেখো যদি মঙ্গলশঙ্খের মতো / বেজে উঠতে পারি।”
পুরানের নতুন ভাষ্য লেখেন :
“বেহুলা নিতান্ত বিনিময় দক্ষ বণিক কন্যা ও সদাগর- বধু আর দেবযানীর কাম্য ছিল বিবাহের নিরাপত্তা ।”
"ফিরে এসো, চাকা।"
এই একটি কাব্যগ্রন্থের জন্য কবি বিনয় মজুমদার – ——————————
(১৯৩৪– ২০০৬)বাংলা কবিতার ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছেন। আঠারো মাত্রার মহাপায়রে বিন্যস্ত এই প্রেমের কবিতা গুচ্ছ । এই কবিতায় উপেক্ষার কথা আছে, নায়িকার সরে যাওয়ার কথা আছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আছে ধৈর্যশীল একাত্মতার স্বর :
“কৌটোর মাংসের মতো সুরক্ষিত তোমার প্রতিভা
উদ্ভাসিত করেছিল ভবিষ্যৎ, দিকচক্রবাল।”
তাঁর কবিতায় উপমাও স্বতন্ত্র ধরনের :
” যে গেছে সে চলে গেছে ; দেশলাইয়ের বিস্ফোরণ
হয়ে
বারুদ ফুরায় না যেন।”
আবার কখনো লেখেন :
“প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্থায়ী হাসি।”
বিনয় মজুমদারের অন্য কবিতার বই “অফ গ্রহণের অনুভূতি মালা” ও “বাল্মীকির কবিতা ।”
আরো এক স্বতন্ত্র পথের পথিক কবি
উৎপল কুমার বসু (১৯৩৯-২০১৫ ) । তিনি
বস্তুজগতের আড়াল থেকে অন্য জগৎ উঠে আসেন।
“ফিরে যাও সাগরে আবার। ফিরে যাও উন্মাদ তুফানে। অস্তিত্বকে ফিরে দাও ।” তাঁর বিখ্যাত কাব্য “পুরী সিরিজ ।” তিনি প্রকৃতির মধ্যে দেখেন হিংস্রতা । ” স্ত্রীলোক আজ রণভূমি ।” তিনি মুখের ভাষার গদ্যে অনবদ্য কবিতা লিখতে পারতেন।
অমিতাভ দাশগুপ্ত (১৯৩৫--২০০৭)
-----------------------------------------------
অমিতাভ দাশগুপ্ত বামপন্থী রাজনীতি করতেন। ভারতের কম্যুনিষ্ট পার্টি র সদস্যপদ গ্রহণ করেন তিনি এবং কিছুদিন জেলে কাটে তাঁর। দেশ পত্রিকায় তাঁর কবিতা সর্বপ্রথম ছাপা হইয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘কালান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক হন।কাব্য রচনার জন্যে নক্ষত্র পুরস্কার এবং প্রসাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন। ১৯৮৯ সালে ইন্দো সোভিয়েত কবি সম্মেলনে প্রতিনিধিস্বরূপ রাশিয়া যান অমিতাভ দাশগুপ্ত। ১৯৯৯ সালে তাঁর ‘আমার নীরবতা আমার ভাষা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্ত হন ।
সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত (১৯৩৫--২০১১)
________________________________
ঢাকা ও কলকাতায় ব্যাপক জনপ্রিয় কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত ১৯৩৫ সালের ৫ মে ঢাকার পুরানা পল্টনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে কলকাতা আসার আগ পর্যন্ত তিনি জীবনের প্রথম ১৬ বছর ঢাকাতেই কাটান। কলকাতায় এসে তিনি বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৫৬ সালের দিকে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। এ পর্যন্ত তাঁর ৩০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর চারটি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে। কবির শেষ কবিতাগ্রন্থ ‘অবৈষ্ণব পদাবলী’ সম্প্রতি কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়। কবিতা ছাড়াও সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত ভ্রমণ কাহিনি ও প্রবন্ধও লিখেছেন। ঢাকা ও কলকাতাকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘দুই নগরী’। সমরেন্দ্র সেন ‘আমার সময় অল্প’ কাব্যের জন্য ২০০৭ সালে পান সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার। ‘কফি হাউজের সিঁড়ি’ কবিতাগ্রন্থের জন্য ১৯৯৮ সালে পান রবীন্দ্র পুরস্কার। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সাহিত্য পত্রিকা ‘বিভাব’ ও ‘কৃত্তিবাস’ সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
“মানুষের মতো এমন সরল প্রাণী আর নেই,
সে এখনো বিশ্বাসপ্রবণ, এখনো সে পেঁপে ও শসা,
নিটোল বেগুন
কিনে আনে বউয়ের জন্য । বিপ্লবীর স্ত্রী করে লক্ষ্মী পূজা;
মন্ত্রীর পরিবার রবিবার হাত দেখায় হরিশ আচার্যকে ।”
মণীন্দ্র গুপ্ত (১৯২৬--২০১৮)
---------------------------------------------
এদের মধ্যে সবচেয়ে বয়সে প্রবীণ কবি। বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। শব্দ ব্যবহারে কুশলতা চমৎকার। তাঁর কবিতা :
“তুমি তরুণী দেবীর মত গূঢ় আলিঙ্গনে
তৎক্ষণাৎ অস্তিত্ব স্পর্শ করো; ওষ্ঠের পাপড়ি খুলে
মধুবাহী কোমল পর্ণাল জিভ আকর্ষণে উঠে আসে মুখে–
ফোঁটা ফোঁটা পুষ্পাসব চুইয়ে পড়ে
মিশ্রিত সোমের রস এবং মাধ্বীক ।”
সুনীল বসু (১৯৩০--)
---------------------------------
কবিতায় থাকে এক শব্দগত হৈ-হুল্লোড়, বিস্ফোরণ, ভাঙচুর।
“এই হপ্ হপ্ পাগলা ঘোড়ার পিঠে
হেই পর্বনা থাকবোই ঝুলে বাজি;
হেই চিৎপাত আচ্ছা আছাড় মিঠে
কাঠের গুঁড়ো ডিগবাজি ডিগ্ বাজি।”
এমন সব কবিতা!
তরুণ সান্যাল (১৯৩২--২০১৮)
-----------------------------------------
কবি বলতে তরুণ সান্যাল বুঝতেন ‘এক বিপ্লবী ব্যক্তিস্বরূপকে’। এই ব্যক্তিস্বরূপ প্রকৃতি, সমাজ, শ্রেণি ও ব্যক্তিসত্তার অন্তঃসার সংগ্রহণে অক্লান্ত। এই কবির প্রকাশভাবনায় থাকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার ইচ্ছে। তরুণ সান্যালের ভাষায়– ‘আমার লেখা ও প্রায় প্রতিটি কবিতাই তাই নিসর্গ, প্রকৃতি, সমাজ ও আত্মবিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে রচনা।’
তাঁর কবিতা রচনার শুরু চোদ্দ-পনের বছর বয়স থেকে। আর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ ১৯৫৬ সালে। নবীন কবি বেড়ে উঠেছেন সাম্যবাদী চেতনায় আর তাঁর সামনে আদর্শের মতো থেকেছেন বিষ্ণু দে, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো কবিরা। সাম্যময় এক উজ্জ্বল সমাজ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এঁদের কবিতায় এবং মার্কসবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে আত্মস্থ করেই কবি হয়ে উঠেছেন তরুণ সান্যাল। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ ও উদ্বাস্তু সমস্যার প্রভাবে পঞ্চাশের অনেক কবিই যখন আত্মমগ্নতায় আশ্রয় খুঁজেছেন, তরুণ সান্যালের কবিতায় তখন স্পষ্ট হয়েছে প্রতিবাদী ও সমাজবিশ্লেষণের প্রবণতা। পঞ্চাশের কবিতায় এর অভিমুখটা আমরা লক্ষ করি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, রাম বসু ও অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতায়।
পূর্ণেন্দু পত্রী (১৯৩১--৯৭)
------------------------------------
আসল নাম পূর্ণেন্দু শেখর পত্রী । পূর্ণেন্দু পত্রী নামে সর্বাধিক পরিচিত; ছদ্মনাম সমুদ্র গুপ্ত । একজন বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সাহিত্য গবেষক, গবেষক, চিত্র-পরিচালক ও প্রচ্ছদশিল্পী।
কবিরুল ইসলাম (১৯৩৪--২০১২)
----------------------------------------------
তাঁর কবিতা আত্মমগ্ন, ধীর ও আস্তিক্যময় । জীবনকে নিয়ে যন্ত্রণার পীড়া নেই । বরং আছে বিরল প্রসন্ন স্নিগ্ধতা ।
” তাই আমার ব্যক্তিগত বিগ্রহের
কোন বিসর্জনও নেই—–
ফলত, প্রতিদিন আমার পূজা
প্রতিদিনই আমার পার্বণ ।”
রবীন সুর (১৯৩৪--৮৮)
------------------------------------
নানা দুঃখ যন্ত্রণা নিয়েও জন্মের যে আহ্লাদ তাই নিয়েই তাঁর কবিতা ।
“এখনও নিভন্ত ধুপ গন্ধ দিচ্ছে, দূর অরুন্ধতী
আলোর ইশারা স্পর্শ করেছে রোমকূপের প্রতিটি শিকড়”
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৬--)
--------------------------------------------------
প্রকৃতি জগত নিয়ে, চারিদিকের সংসার নিয়ে তাঁর কবিতায় এক আত্মস্থ মগ্নতা পাওয়া যায় । চাঁদনী কুয়াশায় ক্ষয়ের গন্ধ জড়ানো , ত্রাস পাষাণের পাতাল । বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিতের (১৯৩৪–) কবিতায় ঠাস বুননে এবং ইঙ্গিত ময় । তাঁর কবিতায় যতিচিহ্ন খুব লক্ষ্য করতে হয় । বাক্যের চেয়ে বাক্যাংশ তাঁর কবিতায় মূল্যবান।
তারাপদ রায় (১৯৩৬-- ২০০৭)
---------------------------------------------
তাঁর কবিতা হালকা ধরনের খুবই আকর্ষক। তুচ্ছের সৌন্দর্য দেখেন তিনি।
“কিঞ্চিৎ রৌদ্রের সঙ্গে চার পাঁচটি ফড়িং মিশিয়ে
ঈশ্বর বললেন ডেকে, ওহে,
তোমার বাড়ির সামনে ফাগুন দ্যাখো হে ।”
ত্রিকালজ্ঞ ঈশ্বরের প্রতি কবির নিবেদন:
“আমাকে বাচাল যদি করেছ মাধব
বন্ধুদের করে দিও কালা।”
এই সময়ের অন্য কবিরা হলেন সুনীল কুমার নন্দী (১৯৩০--), আনন্দ বাগচী (১৯৩৩--), শিব শম্ভু পাল (১৯৩৪--), সাধনা মুখোপাধ্যায় (১৯৩৮--২০২০), রঞ্জিত সিংহ (১৯৩৪--), সুধেন্দু মল্লিক (১৯৩৫--) , দিব্যেন্দু পালিত (১৯৩৯--২০১৯) প্রভৃতি।।
লিখেছেন :– অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া হুগলী।
#banglasahitya #bangladesh
0 Comments